কিশোর আন্দোলন : একটি নিরাপদ সড়ক ও পর্যালোচনা

https://www.dailypanjeree.com/archives/97495

কিশোর আন্দোলন : একটি নিরাপদ সড়ক ও পর্যালোচনা

By দৈনিক পাঞ্জেরী on August 5, 2018 মুক্তমত

 

মো. রবিউল ইসলাম
ঢাকার শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজের দিয়া খানম মিম আর আবদুল করিম দু’টি কিশোর কিশোরীর করুণ মৃত্যু গোটা জাতিকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে একত্রিত করেছে। আমাদের সোনার টুকরা কিশোর কিশোরী সন্তানেরা সোনার বাংলাদেশ গড়ার নিমিত্তে নিরাপদ সড়কের দাবিতে প্রতিবাদমুখর হয়েছে। এটাই সম্ভবত পৃথিবীর প্রথম ও বৃহৎ ‘কিশোর বিপ্লব’ যারা সমস্ত রাষ্ট্রযন্ত্রকে বিকল করে চোখ রাঙিয়েছে। বাংলাদেশ নামক এই রাষ্ট্রটি এখন থেকে ৪৭ বছর পূর্বে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন হয়। আমরা সোনার বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে এই দেশটি স্বাধীন করেছিলাম।
গত ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে দিয়া এবং করিমের বাস চাপায় নিহত হওয়ার জেরে সারা দেশে চলছে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিশু কিশোর আন্দোলন। সড়কে রীতিমত হত্যাকান্ড চলে সেটাকে নিরসনের জন্য সবাই পথে নেমেছে। এই সড়ক দুর্ঘটনার বহুকাল ধরে চলছে; এখন এর অবসান হওয়া উচিত।
আমরা নিরাপদ সড়ক চাই। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে কি হয় তার একটা চিত্র আজ ক’দিন খুব ভালভাবেই ফুটে উঠেছে। এইটুকুন বাচ্চারা কি দারুণ ক্ষোভে ফেটে পড়ছে! কোথায় তাদের এত দুঃখ! কেন এই বিস্ফোরন? এদের প্ল্যাকার্ডগুলো পড়ার চেষ্টা করুন। ওরা ৯ টাকায় জিবি (ইন্টারনেট ডাটা) চায় না; নিরাপদ সড়ক চায়।
শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবিগুলো হচ্ছে :
(১) বেপরোয়া চালককে ফাঁসি দিতে হবে এবং এই শাস্তি সংবিধানে সংযোজন করতে হবে, (২) নৌপরিবহন মন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহার করে শিক্ষার্থীদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে, (৩) শিক্ষার্থীদের চলাচলে এমইএস ফুটওভারব্রিজ বা বিকল্প নিরাপদ ব্যবস্থা নিতে হবে, (৪) প্রত্যেক সড়কের দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় স্পিড ব্রেকার বসাতে হবে, (৫) সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ছাত্রছাত্রীদের দায়ভার সরকারকে নিতে হবে, (৬) শিক্ষার্থীরা বাস থামানোর সিগন্যাল দিলে থামিয়ে তাদের বাসে তুলতে হবে, (৭) শুধু ঢাকা নয়, সারাদেশে শিক্ষার্থীদের জন্য অর্ধেক ভাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে, (৮) রাস্তায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল এবং লাইসেন্স ছাড়া চালকদের গাড়ি চালনা বন্ধ করতে হবে এবং (৯) বাসে অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া যাবে না।
তবে কেবল এই দাবিগুলোই নিরাপদ সড়কের জন্য কিন্তু যথেষ্ট নয়। এর সাথে আরো কিছু বিষয় আছে যা সড়কের গতিপথকে প্রশস্ত এবং ঝকঝকে পরিস্কার করতে পারে। রাস্তায় যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা ফেলা, ব্যবসায়ীদের ফুটপাত দখলে নেওয়া, বিপজ্জনক ভাঙাচোরা রাস্তা, রাস্তা খোড়াখুড়ি, জলমগ্ন রাস্তা ও খানাখন্দকে ভরা বাস টার্মিনালসমূহ, ছোট বড় যানবাহন রাস্তার উপরে রাখা ইত্যাদি একদিকে যেমন রাস্তাকে সংকুচিত করে দিচ্ছে অন্যদিকে অপ্রাপ্ত বয়স্ক গাড়ি চালক, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভার আর নির্দেশনাহীন ট্রাফিক এই পরিবেশকে আরো বিষাক্ত করে তুলেছে। এমন পরিস্থিতিতে দলমত নির্বিশেষে সকল শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারি, অভিভাবক, সমাজসেবী সংগঠনসহ সকল ব্যক্তি-দল-জনগোষ্ঠী এসবের বিরুদ্ধে এগিয়ে আসছে। বাচ্চারা আন্দোলন করছে, নিরাপদ সড়কের দাবি জানাচ্ছে; শিক্ষার্থীদের দাবি অত্যন্ত যৌক্তিক। রাস্তাঘাট এবং যানবাহনের টেকসই উন্নয়ন খুবই জরুরি। নিরাপদ সড়কের সাথে সাথে নিরাপদ যানবাহন এবং নিরাপদ চালকও অত্যন্ত জরুরি। সর্বোপরি, এ দেশ আমাদের, শিক্ষার্থীরা আগামীর কান্ডারী, এদের হাতেই এ দেশের ভবিষ্যত। সকলের সহযোগিতা-ই এ দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে নিরাপত্তা, শান্তি, শৃঙ্খলা ও আদর্শের মাধ্যমে। এই আন্দোলন এবং নিরাপদ সড়কের বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত পর্যালোচনা।
কিশোর আন্দোলন : ভাবুন তো আন্দোলনকারীদের বয়স কত হবে বড়জোর ২০ বছর! এরা সেই প্রথম প্রজন্ম যাদের শৈশবই কেটেছে ফেসবুকে মাথাগুঁজে। কৈশোরেই এরা গুগলে সার্চ দিয়ে বিশ্ব দেখছে। উন্নত বিশ্বের চিন্তাধারা এদের মস্তিষ্কে উঁকি দিচ্ছে। বাচ্চারা নিরন্তর এগুলো দেখে মনটাকে প্রবোধ দিতে পারে না। ওরা চায় সুশৃঙ্খল রাষ্ট্র। আগামীর সেরা প্রজন্ম এরা।
বাংলাদেশে সবগুলো সেনানিবাসের মধ্যে ঢাকা সেনানিবাস (কচুক্ষেত-সৈনিক ক্লাব) দিয়ে সবচেয়ে বেশি অসামরিক চলাচল করে। ঢাকা সেনানিবাস দিয়ে হাজার হাজার অসামরিক নাগরিকের গাড়ি, বাইক প্রতিদিন চলাচল করে। এমনকি অনেক গণপরিবহনও চলে। আজ অব্দি কখনও শুনিনি সেনানিবাসের ভেতর সড়ক দুর্ঘটনায় কেউ মারা গেছে (সর্বোচ্চ ২/১ জন আহত হয়েছেন হয়তো)। খুব বেশি হলে ১০ বছরে ১ জন মারা গেছে। এতো চলাফেরা সত্ত্বেও কখনও দেখিনি কোন যান হঠাৎ করে গতি বাড়িয়ে দিয়েছে; কোন বাস রেস খেলা তো দূরে থাক, ঠুকাঠুকিও করতে দেখিনি। এতো গাড়ি তবুও কেউ কখনও বেপরোয়া গতিতে চালায় না। অথচ কয়জন মিলিটারি পুলিশইবা (এমপি) থাকে! কেউ নিয়ম ভাঙে না ওখানে। সবাই নিজ দায়িত্বে লাল-সবুজ বাতি মেনে চলে। সবাই নির্ধারিত ৪০-৫০ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চালায়। এর কারণ কি জানেন? শুধুমাত্র আইনের সঠিক প্রয়োগ।
লাইসেন্স ফিটনেসবিহীন যানবাহন : রাজধানীজুড়ে এখন লক্কড়-ঝক্কড় ফিটনেসবিহীন গাড়ির ছড়াছড়ি। অবাধে চলাচল করছে যাত্রীবাহী এসব গাড়ি। তদারকির কেউ নেউ। এই অনিয়ম যুগরে পর যুগ ধরে চলছে। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার মৃত্যুউপত্যকায় পরিণত হয়েছে। তার বড় কারণ এই ধরণের যত অনিয়ম। আরও উদ্বেগের কথা, গাড়ির নিবন্ধন থাকলেই সেই গাড়ির যে ফিটনেস বহাল থাকবে, তা নয়। জানা যায়, যেসব যানবাহনের ফিটনেস রয়েছে, সেগুলোও যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হয় না। কারণ, ৪০ ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা করে একটি যানবাহনের সনদ দেওয়ার কথা; কিন্তু বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ খালি চোখে একটুখানি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই ফিটনেস সনদ প্রদান করে। ২০১১ সালের অক্টোবর হতে স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স চালু করা হয়। তারপরও জাল লাইসেন্স সংগ্রহের প্রবণতা কমেনি বলে জানা যায়। এ ধরনের অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার অবসান হওয়া প্রয়োজন। কারণ, দেশে বছরে কমপক্ষে ১২ হাজার হতে ১৫ হাজার সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। বেশিরভাগ সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী আনাড়ি চালক ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন। সুতরাং সড়ক দুর্ঘটনা রোধকল্পে যথাযথ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন প্রয়োজন। অনেক লাইসেন্সধারী চালক আছেন যাদের প্রশিক্ষণ নেই। ভয়াবহ ব্যাপার হলো, চালকদের শতকরা ৩৫ শতাংশের বয়স ১৫ বছরের নীচে যাদের শিশুই বলা যায়!
ফুটপাত দখল : ফুটপাত মানে পায়ে চলার পথ। সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান যেমন ট্রাফিক পুলিশের বক্স থেকে প্রায় সব ধরণের প্রতিষ্ঠান এটির উপরে প্রখর দৃষ্টি। বিভিন্ন ধরনের দোকান, নানা জিনিসের পসরা, ময়লা-আবর্জনার স্তূপ-এসব কারণে রাজধানীর বিভিন্ন প্রধান সড়কসংলগ্ন ফুটপাত বেদখল হয়ে আছে। এতে ফুটপাতে চলাফেরায় যেমন বিড়ম্বনা পোহাতে হচ্ছে, তেমনি ঘটছে পরিবেশ বিপর্যয়। পথচারীদের চলাচলের জায়গা না থাকার কারণে রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। মুঠোফোন রিচার্জ, চা দোকান, জুতো সেলাই-সব চলছে ফুটপাত ঘিরে। সড়কের পাশের ফুটপাতে সারি সারি দোকান গড়ে উঠেছে। রাজধানীতে ফুটপাত দখল করে চলছে রমরমা বাণিজ্য। শুধু হকার নয়, সরকারি সেবা প্রদানকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দখলেও রয়েছে রাজধানীর ফুটপাত। ফলে রাস্তায় চলতে গিয়ে চরম বিড়ম্বনায় পড়েন পথচারীরা। ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি। ম্যানহোলের ঢাকনা না থাকাতে আরো বিড়ম্বনা। টেলিফোন লাইন বক্স, ডিস লাইনের ঝুলন্ত তার, নোংরা ময়লা আর্জনা, সভা সমাবেশ, অবৈধ স্থাপনা সবই ফুটপাতকে কলুষিত করছে। রাজধনীসহ দেশের সব এলাকার ফুটপাতই প্রায়ই বিভিন্ন গোষ্ঠীর দখলে রয়েছে। এটিকে মুক্ত করা প্রয়োজন।
রাস্তা খোড়াখুড়ি : ঢাকার অনেক সড়ক সবসময় খোঁড়াখুড়ির কবলে। কিছু সড়কে পাইপ বা কেব্ল বসানোর কাজ শেষ করার পর অরক্ষিত থাকে। কিছু গর্ত উঁচু করে পাকা করার কারণে চলাচলে দুর্ঘটনা ঘটছে। কিছু সংযোগ সড়ক বন্ধ হয়ে গেছে। এক সেবা সংস্থার অসতর্ক খোঁড়াখুড়ির কারণে অপর সংস্থার পাইপলাইন ফুটো হয়ে অচল হয়ে যাচ্ছে। দেখা যায় যে, খোঁড়া অংশ ভরাট করে রাস্তার তুলনায় উঁচু পাকা বক্স ও স্ল্যাব দেওয়া হয়েছে। টানা স্টর্ম সুয়ারেজ লাইন করে একইভাবে রাস্তার তুলনায় উঁচু বক্স করা হয়েছে। গর্ত খোঁড়াতে ভোগান্তি চরমে ওঠে। খোঁড়াখুড়ির সময়ে প্রধান সড়কের অর্ধেকটা জুড়ে ভেঙে ফেলা অংশের ধ্বংসাবশেষ, মাটি, বালু, ইট দীর্ঘ সময়েও সেগুলো সরানো হয় না। সড়কে দুঃসহ যানজটের সৃষ্টি হয়। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না থাকায় উন্নয়ন কাজের প্রতি সাধারণ মানুষের বিরক্তি সৃষ্টি হয়েছে।
ভাঙ্গাচোরা রাস্তাঘাট : বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ সড়কই অসংখ্য খানাখন্দে ভরা। বিভিন্ন অজুহাতে ক্ষতিগ্রস্ত এসব সড়ক মেরামত করা হচ্ছে না। কিছু সড়কেন দুরবস্থা চরমে। ব্যস্ততম অনেক সড়কে যত দূর চোখ যায় শুধু বড় বড় গর্ত। রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের অনেক এলাকায় সড়কের বেহাল অবস্থা, ছোট-বড় গর্ত। অতিবৃষ্টি হলে রাজধানীর সড়ক ব্যবস্থা একবারে ভেঙ্গে পড়ে।
সঠিক সময়ে কাজ শেষ না হওয়া : নগরীর রাস্তা মেরামত ও উন্নয়ন কাজ চলমান আছে। সুনির্দিষ্ট সময় বেধে দেওয়া আছে। কিন্তু সঠিক সময়ে কাজ শেষ হয় না। কাজের গতিও বাড়ে না। রিভাইজড বাজেট করে বেশি সময় ও অর্থ উভয়টাই তুলে নে ঠিকাদারগণ। কোনও নির্দেশনা মানতে চান না প্রভাবশালী ঠিকাদাররা। তারা মাসের পর মাস মানুষকে ভুগিয়ে নিজেদের সুবিধামতো কাজ করেন। সঠিক নজরদারি না থাকায় কাজের মানও অনেকক্ষেত্রে ভালো হয় না। কাজের সুবিধার্থে ঠিকাদার সড়কের একপাশ খুঁড়ে বিশাল গর্ত করে রাখেন, সুবিধামত কোথাও ভরাট করে আবার কোথাও করেন না।
জলবদ্ধতা : দিনে দিনে ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতার চিত্র। ঘণ্টা প্রতি ১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতেই এই শহরের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই তলিয়ে যায়। বর্ষাকালে পরিস্থিতি হয়ে ওঠে আরো ভয়াবহ। ঢাকায় জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণগুলো হলো-অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা ফেলা, বর্ষায় খোড়াখুড়ি, নদী ভরাট, খাল দখল, জলাশয় ভরাট, বুড়িগঙ্গা দূষণ আর দখল, অপরিকল্পিত বক্স কালভার্ট, সমন্বয়হীন সংস্কার কাজ, পলিথিনের অবাধ ব্যবহার, ড্রেনের ময়লা পুনরায় ড্রেনে গড়িয়ে পড়া ইত্যাদি।
ময়লা আবর্জনার ভাগাড় : কর্তৃপক্ষের নাকের ডগায় গড়ে উঠেছে ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়। দুর্গন্ধময় পরিবেশে নাক চেপে আবর্জনা ফেলার স্থান অতিক্রম করতে হয় পথচারীদের। সরু রাস্তায় নিয়মিত যানজটে আবর্জনার সামনে আটকে থেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন যাত্রীরা। আবর্জনা ফেলার কারণে অনেক জায়গায় একটি বা দু’টি লেন চলে যায় দখলে। মহাসড়ক দখল করে আবর্জনার ভাগাড় গড়ে তোলা হলেও তা দেখার কেউ নেই।
ট্রাফিক সিগনাল না মানা : নিয়ম অনুযায়ী সবুজ সংকেত দেখা গেলেই ট্রাফিক পুলিশ যান চলাচলের অনুমতি দেবেন। কিন্তু বর্তমানে ট্রাফিক ব্যবস্থায় এ নিয়ম মানা হচ্ছে না। ফলে মোড়গুলো পার হতে দীর্ঘক্ষণ যানবাহনকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এজন্য ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার খুবই প্রয়োজন।
বাস স্টপেজ না থাকা : রাজধানীর কিছু স্থানে সুনির্দিষ্ট বাস স্টপেজ নেই; কিছু স্টপেজে আবার নির্ধারিত স্থানে চালকরা গাড়ি থামাতে চান না। এক্ষেত্রে যাত্রীদের দৌঁড়ে যেয়ে বাসে উঠতে হয়। ছেলেরা মেয়েরা দৌঁড়াচ্ছে, বাবা মারা দৌঁড়াচ্ছে, ছাত্র-ছাত্রীরা দৌঁড়াচ্ছে, বুড়োবুড়ি দৌঁড়াচ্ছে, এমনকি বাসও দৌঁড়াচ্ছে। দেখে মনে হয় যেন রেস চলছে। এটা থেকে মুক্তি পাওয়া খুবই প্রয়োজন।
রাজধানীর বাসে ভাড়া নৈরাজ্য : ভাড়া নিয়ে বচসা নিত্তনৈমিত্তিক ব্যাপার। এই বিশাল ঢাকা নগরীতে কোথাও এমন কোন লেখা চোখে পড়বে না কোন স্থানের দূরত্ব কত কিলোমিটার। এক্ষেত্রে রাজধানীতে চলাচলকারী সকল পরিবহনকে মাত্র কয়েকটি কোম্পানির অধীনে পরিচালনা করলে অনেকখানি নৈরাজ্য কমে আসবে। সিটিং আর লোকাল দুই শ্রেণির বাসের রং করতে হবে আলাদা। সিটিং সার্ভিসে দাঁড়িয়ে যাত্রী পরিবহন করা যাবে না এবং স্টপেজ থাকবে কম। সিটিং সার্ভিস ও লোকাল বাসের ভাড়ার হার ঠিক করা এবং তা কীভাবে কার্যকর করা হবে সেটি যাত্রীদের জানাতে হবে। লোকাল বাসে বাদুড়ঝোলা করে যাত্রী পরিবহন বন্ধ করা প্রয়োজন। গণপরিবহনে বাধ্যতামূলকভাবে পাখা চালু রাখা, বাস সর্বদা দৃষ্টিনন্দন রাখা, আসনব্যবস্থা মানসম্মত রাখা ও জানালায় পর্দা থাকা ইত্যাদির দিকে নজর দেওয়া উচিত। স্কুল-কলেজের জন্য নিজস্ব বাস সেবা চালু করা এবং নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ও বয়স্কদের জন্য বরাদ্দ করা আসন নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। গণপরিবহনের চালক ও সহকারীদের পোশাক নির্ধারিত করা, পরিচয়পত্র থাকা, স্টপেজ ব্যতীত রাস্তার মাঝখানে দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো বন্ধ করা, পাশাপাশি একসঙ্গে একাধিক যান স্টপেজে দাঁড় না করানো ইত্যাদি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাস চলাচলের অনুপেযোগী : সাধারণ মানুষের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা গণপরিবহনের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে, তাতে শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্য বলে কিছু নেই। বছরের পর বছর ধরে এ খাতটিতে এক অরাজক পরিস্থিতি চলছে। ন্যূনতম যাত্রীসেবা বলতে কিছু নেই। নিরুপায় যাত্রীদের গন্তব্যে ফেরার জন্য প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে যাতায়াত করতে হচ্ছে। একেতো চাহিদার তুলনায় গণপরিবহন পর্যাপ্ত নয়, অন্যদিকে লক্কর-ঝক্কর মার্কা ও চলাচলে অনুপযোগী বাস-মিনিবাসের সংখ্যাও অত্যধিক। এসব দেখার যেন কেউ নেই।
মন্ত্রী এমপিদের গাড়ীর ড্রাইভারের লাইসেন্স না থাকা : কিশোরেরা চোখে আঙুল দিয়ে বিষয়টি দেখিয়ে দিয়েছে। শিক্ষার্থীরা পুলিশের ডিআইজেকে রাস্তায় ধরে গাড়ির কাগজ এবং ড্রাইভারের লাইসেন্স দেখতে চেয়েছিল কিন্তু দেখাতে পারেনি। পুলিশের গাড়ীর লাইসেন্স ও নাম্বার প্লেট না থাকাটা খুবই অন্যায়। অবশ্য, ডিএমপি কমিশনার পুলিশ সদস্যদের ড্রাইভিং লাইসেন্স সঙ্গে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
পথচারীদের পারাপারের ব্যবস্থা : রাজধানীতে প্রয়োজনীয় ফুটওভার ব্রিজ, স্পিড ব্রেকার ও জেব্রা ক্রসিং থাকা বাঞ্ছনীয়। দায়িত্বশীল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অব্যাবস্থাপনা, অদক্ষতা এবং উদাসীনতা এখানে থাকলে চলবে না। দুর্ঘটনা প্রতিরোধের উপায়ের পাশাপাশি পথচারীদের নিরাপত্তা, তাদের শারীরিক শ্রম এবং অপারগতার বিষয়টিও ঢাকা নগরের যাতায়াত পরিকল্পনা সংশ্লিষ্টদের উপলদ্ধি করতে হবে। বৃদ্ধ, অসুস্থ রোগী, প্রতিবন্ধী, মহিলা, শিশু, ক্লান্ত পথিক, মালামাল বহনকারী মানুষের জন্য নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা দরকার। রাজধানীর অধিকাংশ স্পিড ব্রেকার ক্ষয় হয়ে গেছে।
প্রতিযোগিতা করে গাড়ি চালানো : প্রতিযোগিতা করে গাড়ি চালানোর ফলে সড়কে দুর্ঘটনার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এখনই এভাবে গাড়ি চালানোর উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে।
চালকদের ট্রিপভিত্তিক মজুরি : বাস মালিকরা অর্থবিত্তে বলীয়ান, রাজনৈতিক ক্ষমতায় প্রতাপশালী। মালিকরা তাদের গাড়িগুলো লীজ বা নির্দিষ্ট আর্থিক চুক্তিতে অপরিপক্ক ড্রাইভারদের অধীনে পরিচালনার ভার দেয়। চালকরা ট্রিপভিত্তিক মজুরিতেই চালান। ইচ্ছেমত যাত্রী উঠানোর প্রতিযোগিতা, বেশি যাত্রী নেয়া, ওঠানো-নামানোর চলে রাস্তার মাঝখানে। ফলে ঘটছে অনেক দুর্ঘটনা। নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, দুর্ঘটনায় একজন মানুষের মৃত্যু মানেই একটি পরিবারের জন্য সারা জীবনের দীর্ঘশ্বাস বয়ে আনে। সড়কের এ করুণ পরিণতি থেকে কোনোভাবেই রেহাই পাওয়া যাচ্ছে না। ট্রাফিক কর্মকর্তারা জানান, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণেই দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। চালতরা আইন-কানুন মানছে না বলে দিন দিনই দুর্ঘটনা বেড়ে চলেছে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে দেশে আইন আছে, রয়েছে শাস্তির বিধান। কিন্তু এই আইনের প্রয়োগও সন্তোষজনক নয়। তাই সড়ক-দুর্ঘটনার দায়ে অভিযুক্ত চালকদের সাজা ভোগের নজিরও দেখা যায় না। মাসিক বেতন না থাকায় প্রায় ৯৫ শতাংশ চালকই রোজগারের জন্য দিনে আট ঘণ্টার বদলে ১৪ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত গাড়ি চালাতে বাধ্য হচ্ছেন। দৈনিক ট্রিপনির্ভর বেতন হওয়ায় বাড়তি আয়ের জন্য স্থানে স্থানে যাত্রী তোলেন তারা। বিশ্রাম না নিয়ে, নির্ঘুম রাত কাটিয়ে আয় করা বাড়তি টাকার পুরোটা অবশ্য তারা ঘরে নিতে পারেন না। প্রত্যেকটি গাড়ির দু’টি লুকিং গ্লাস থাকা প্রয়োজন, একটি ডান হাতের পাশে আরেকটি বাম হাতের পাশে। গাড়ি চালানোর সময় লুকিং গ্লাস থাকাটা জরুরি। কারণ আপনার পাশ দিয়ে কোন গাড়ি যাচ্ছে-তা আপনি সহজেই দেখতে পারবেন। আর নিরাপদে গাড়ি চালাতে পারবেন। সেটি অধিকাংশ গাড়িতে নাই।
পথে পথে চেকিং বসানো : মালিকপক্ষ পথে পথে চেকিং বসিয়ে এক অসহনীয় পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। কিছু দূর পরপর চেক আর তাতে বেড়ে যায় অন্তত ১০টাকার অতিরিক্ত ভাড়া। সামান্য হাফ কিলোমিটার বা এক স্টপেজ গেলেই এটি প্রদান করতে বাধ্য থাকতে হয়।
ইউলুপ : ঢাকা শহরের অনেক জায়গায় ইউলুপ দরকার। এটির ফলে একদিকে যানজট কমে আসবে অন্যদিকে দুর্ঘটনাও কমবে।
রাস্তায় বাজার বসানো : রাজধানীর অধিকাংশ ফুটপাতে গড়ে তোলা হয়েছে স্থায়ী/অস্থায়ী, ফুটপাত ছাপিয়ে সড়কে বসছে সবজির বাজার, আছে পোশাকের দোকানও, দোকানগুলোতে চলে জমজমাট বিকিকিনি। এটিকে নিয়ন্ত্রণ করা আবশ্যক।
রাস্তায় লেন না থাকা : ঢাকার অধিকাংশ রাস্তায় কোন লেন নেই। কোন কালির আঁচড় নেই। অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি সেবায় ব্যবহারের জন্য রাজধানীর রাস্তায় ‘জরুরি লেন’ বানিয়ে দেখিয়েছে কিশোরেরা। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের চলাচল, অ্যাম্বুলেন্স ও পুলিশের জরুরি সেবায় ব্যবহারের জন্য রাজধানীর সড়কে আলাদা লেন খুবই প্রয়োজন।
চাঁদা আদায় : রাস্তায় দেদার চলে ফিটনেসবিহীন গাড়ি, লক্কর-ঝক্কর তুফান মেল। প্রতিদিন পরিবহন নেতা আর পুলিশকে মাসোহারা দিয়েই এসব ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মাসে এসব ফিটনেসবিহীন গাড়ি থেকে চাঁদা আদায় করা হয়।
সড়কে নির্মাণ সামগ্রী রাখা : সড়কে নির্মাণ সামগ্রী রাখার ফলে সড়কের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। বালু রাস্তায় ছড়িয়ে যাচ্ছে, বাতাসে উড়ে ঘর বাড়ি ভরে যাচ্ছে, পথচারীদের কষ্ট হচ্ছে। শুড়কি, ইট, খোয়া, পাথর মানুষের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
স্কুল কলেজ বাস : স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য বাসের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
চালকের ছবি টানানো : ছোট বড় প্রতিটি যানে চালকের ছবিসহ লাইসেন্সের পার্টিকুলারসহ টানানো প্রয়োজন।
প্রশিক্ষণ কেন্দ্র : চালক ও সহকারীদের জন্য আরো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রয়োজন। আমাদের প্রত্যয়, এ দেশ আমাদের, আমরা দেশকে সুন্দরভাবে গড়ার কাজে অগ্রগামী থাকবো।

 

(Visited 14 times, 1 visits today)

Leave A Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *