সেদিন যদি আমার পা’টাও কাটা পড়তো!

সেদিন যদি আমার পাটাও কাটা পড়তো!

 কাটা পা নিয়ে আনন্দ মিছিল! এটা আধুনিক মানব সভ্যতার নির্মম বর্বরতার নতুন পরিচায়ক!

লেখক-মোঃ রবিউল ইসলাম

এপ্রিল ১৩, ২০২০

যখন গ্রামের প্রাইমারী স্কুলে ক্লাস থ্রি’তে পড়তাম তখন আমাদের হেড স্যারের ছেলে শক্তি পরীক্ষার জন্য আমাকে অফার দিয়েছিলো। আমি সজ্ঞানে অফারটি গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু তখন আমার মাথায় আসেনি কি ঘটতে যাচ্ছে আমার ছোট্ট দেহটির উপরে! একদিন স্কুল ছুটির পরে বাড়ি ফেরার পথে একটি কাটাযুক্ত বড় আকারের খৈ গাছের নিচে আমাদের শক্তি পরীক্ষার যায়গা নির্ধারণ করা হলো। তপ্ত দুপুর। খা খা রৌদ্র। গাছপালা, গুল্মলতাগুলি তীব্র তাপে যেন নেতিয়ে পড়েছে! পাশে বাঁশবাগানবেষ্টিত সারিসারি কবর, ঘন বাঁশের ক্যাচ কুচ শব্দ আর বাঁশপাতার মর্মর ধ্বনি মনের মধ্যে যেন মনটা দুরুদুরু করছিলো। অচেনা, নাম না জানা করবস্থানের শায়িত আত্মাগুলির কথা সশ্রদ্ধ স্মরণে এলো। মানুষের আনাগোনা তেমন নাই। চারিদিকের পরিবেশ নিরব নিথর, সুনশান। সামান্য একটু দূরে গ্রামের পুকুরে নারী পুরুষের গোসলে ব্যস্ততার শোরগোলই একমাত্র কানে এসে ধাক্কা দিচ্ছে।

যাক সেসব কথা! এবার স্কুলের ড্রেস পরা অবস্থায় শুরু হলো ‍উভয় পক্ষের শক্তি পরীক্ষা, ঝটপট চললো কিল, ঘুষি। তাছাড়া ছোট্ট দেহের লোহিত কণিকার আবেশে কুস্তিগীরদের মতো করে একের ‍বুকে অন্য জনের চেপে বসার মহড়াও চললো বেশ কিছুক্ষণ। আমি আর পেরে উঠছিলাম না। বেশ নাজেহাল হয়ে গলাম। গলার কাছে ছোট্ট আত্মাটা বের হওয়ার উপক্রম। বেশ হাফিয়ে উঠলাম। আমি হাত উঁচু করে স্যারেন্ডার করলাম। আর সেই দিনের মনের শক্ত প্রতীজ্ঞা আজো টিকে আছে যে, আর কোন দিন শক্তি পরীক্ষা করবো না। তবে মাঝে মধ্যে হার্ট পরীক্ষা করাই যাতে বোঝা যায় ভালো আছি কিনা! আলহামদুলিল্লাহ।

ঐ দিকে স্যারের ছেলে ভি-চিহ্ন দেখিয়ে বিজয় উল্লাসে ফেটে পড়েছিলো। আর আমাদের সহপাঠী প্রায় গোটা পাঁচেক বন্ধু আমাদের সেই ঐতিহাসিক দৃশ্যপটের স্বাক্ষী হয়ে রইলো। সেটি আমি মাঝে মাঝে স্মরণ করি। আর ভয় পাই। আমার সেই মারামারির কথা মনে করে এই ভেবে আজ শিউরিয়ে উঠলাম যে, সেই দিনটি যদি আজকের এই ডিজিটাল যুগের দিন হতো তাহলে আমার একটি পা হয়তো হারাতে হতো! আর স্যারের ছেলে আমার কাটা পা’খানি নিয়ে সারা গ্রামে মিছিল আর স্লোগানে ভরিয়ে দিতোঃ

দিয়েছি অনেক ঘা!

ছিনিয়ে নিয়েছি পা।

কি নৃশংসতা দেখা যাচ্ছে আজকের এই দিনগুলিতে, তাই না! এক অবিমিশ্র দুঃখে ভরা। মানুষের প্রভাব প্রতিপত্তিকে কত বড় করে দেখছি। আমাদের অহংকারের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আমাদের মনুষত্ব আজ ধূলায় মিশে গেছে। বিশ্ব যেখানে জ্ঞান বিজ্ঞানে একের সাথে অন্যের প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত সেখানে আমরা প্রতিপক্ষের কাটা পা নিয়ে উল্লাসে ব্যস্ত। পৃথিবী যেখানে মানুষের মানবতা রক্ষায় সর্বান্তকরণে চেষ্টা করছে, সেখানে আমরা মানবতাকে ভূলণ্ঠিত করছি।

ঘটনাটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে যেখানে প্রতিপক্ষের পা কেটে নিয়ে আনন্দ মিছিল করা হয়েছে। সবচাইতে বড় কথা হলো, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে যেখানে জেলাটি লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে অথচ এই লকডাউন ভেঙে শত শত মানুষ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়েছেন। আহা! করোনার মধ্যে একটু যেন শান্তির ছায়া খোঁজা! লকডাউন ভেঙে একটু পা কাটার প্রাক্টিস করা! সকলে মিলে নতুন আমেজ তৈরি করা। আর গ্রামময় ঘুরে জানান দেওয়া যে, আমরা আছি তোমাদের পাশে পা কাটার মহড়া দিতে। বাড়িতে থাকতে থাকতে পা দুটি ফুলে যাচ্ছিলো তো! তাই একটু স্বস্তি খুঁজতে প্রতিপক্ষের পা কেটেছি। এটা কোন ধরণের চতুষ্পদ জানোয়ারী জীবনে পা দিলাম। জাতির জন্য কোন অশনি সংকেত! এটা কোন জাতি! যে জাতিকে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সখ করে ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছিলো এটা কি সেই জাতি! না পা কাটা জাতি?

শত শত মানুষের উপস্থিতিতে দুই পক্ষের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের একজনের পা কেটে হাতে নিয়ে আনন্দ মিছিল করেছে আরেক পক্ষ। দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। সংঘর্ষ চলাকালে ধারালো অস্ত্র দিয়ে মোবারক মিয়া (৪৫) নামে এক ব্যক্তির পা কেটে নিয়ে গ্রামে আনন্দ মিছিল করে একপক্ষ। সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে তা নিয়ে প্রতিপক্ষের লোকেরা ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানে মিছিল ও উল্লাস করেছে। আমরা বাবা চাচারাতো  ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানে মিছিল দিয়ে দেশকে স্বাধীন করেছিলো। এরা একটা পা কেটে কি স্বাধীন করলো এটা ভাবতে তো গা শিউরে উঠে। পা কেটে নিয়ে কি ধরণের আনন্দ মিছিল!

(Visited 14 times, 1 visits today)

Leave A Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *